Know info before watch, but no Spoiler

Showing posts with label Biography. Show all posts
Showing posts with label Biography. Show all posts

একজন রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের কথা

Iron man, avenger,  avengers end game, avengers 2019, rdj,

আই অ্যাম আয়রন ম্যান’—এই সংলাপের পর তাঁর পরিচয় নতুন করে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এক সংলাপে ডুবতে বসা ক্যারিয়ার এবং মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স দুই-ই একসঙ্গে দেখেছিল সাফল্যের মুখ। তাঁর নাম রবার্ট ডাউনি জুনিয়র। এর চেয়ে বড় করে পরিচয় দেওয়ার মতো আসলেও কিছু নেই। কারও কাছে টনি স্টার্ক, আবার কারও কাছে শার্লক হোমস।

আমাদের জীবনের প্রথম সুপারহিরো হয়ে আসেন আমাদের বাবা। হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, ‘পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই।’ রবার্ট ডাউনির ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থে তাঁর বিপরীত। তাঁর জীবনে তাঁর বাবা কোনো সুপারহিরো নন, বরং সুপার ভিলেন। ছয় বছরের বাচ্চার হাতে যেখানে বাবারা তুলে দেন আইসক্রিম কিংবা চিপস, সেখানে তিনি তুলে দিয়েছিলেন মাদক। ছয় বছর বয়সে নিয়মিত হিরোইন সেবন করা ডাউনি আট বছরের মধ্যেই হয়ে যান পুরোপুরি মাদকাসক্ত। একজন মাদকাসক্ত যেভাবে গোগ্রাসে মাদক সেবন করতে পারে, ঠিক সেভাবেই পারতেন রবার্ট ডাউনি জুনিয়র।

বাবা রবার্ট ডাউনি সিনিয়রকে নিজের জীবনের সুপার ভিলেনের বদলে অ্যান্টি হিরো হিসেবে কল্পনা করলেই ভালো হবে। মুখে মাদক তুলে দেওয়ার আগে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন সিনেমার ক্যামেরার সামনে। সিনিয়র রবার্ট ডাউনি ছিলেন সিনেমার পরিচালক, নিজের বানানো ‘পাউন্ড’ (১৯৭০) সিনেমায় এক মিনিটের চরিত্রে সুযোগ দেন ছেলেকে। সিনেমায় তাঁর একমাত্র সংলাপ ছিল, ‘ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি হেয়ার ইন ইয়োর বলস?’ ওটুকুই যথেষ্ট ছিল। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকানো নয়। একসঙ্গে দুই নেশায় জড়িয়ে পড়ে ছোট্ট ডাউনি। এক মাদক, দুই অভিনয়। গভীর রাতে এই দুই নেশার একমাত্র দর্শক ছিলেন তাঁর বোন অ্যালিসন। মাদকে যখন পুরোপুরি ডুবে আছেন, তখনই শিখে ফেললেন ব্যালে নাচ, মাত্র ১০ বছর বয়সে!
মা এলসি অ্যানের অভিনয় ক্যারিয়ার আর রবার্ট ডাউনি সিনিয়রের সিনেমা। দুইয়ের মধ্যে এক হয়ে ছিল দুই ভাইবোন অ্যালিয়াস আর অ্যালিসন। কিন্তু তা–ও শেষ হয়ে গেল ১১ বছর বয়সে। মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ দুই ভাইবোনকে সরিয়ে দিল চিরতরে। স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার বেদনায় সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মদ্যপান করতেন ডাউনি সিনিয়র। ১৭ বছর বয়সে তাঁকে বের করে দেওয়া হয় স্কুল থেকে। বাবা তাঁকে ছেড়ে দিয়েছেন, সঙ্গী বলতে ওই এক মাদক। এ অবস্থায় এসে ভাবলেন, মাদক সেবন বাদে আর একটি জিনিসই তিনি পারেন, সেটা হলো অভিনয়!

বাবার নামের জোরে হলিউডপাড়ায় টুকটাক ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করে সময় কাটছিল। কিন্তু পাশার দান বদলে দিল ‘লেস দ্যান জিরো’ সিনেমার স্ক্রিপ্ট! সেখানে তাঁর চরিত্র ছিল জুলিয়ান ওয়েলস নামে এক তরুণের, যার পুরো জীবন কেটেছে মাদকে ডুবে। কোকেনে ডুবে থাকা ওয়েলসের চরিত্রে যেন জীবন্ত হয়ে উঠলেন রবার্ট ডাউনি জুনিয়র। সিনেমা শেষ করার পর নিজের কাছেই উপলব্ধি করলেন, এই যে দর্শকের তালি পাচ্ছেন, তা তো অভিনয়ের জন্য নয়। এই জুলিয়ান ওয়েলস তো অন্য কেউ নন, এ তো তাঁর নিজের জীবনের কাহিনি। নিজের জীবনকে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরেছেন, সিনেমার পর্দায় ছাড়তে পেরেছেন, তবে বাস্তবে কেন নয়?

১৯৮৯ সালে ‘দ্যাটস অ্যাডেকোয়েট’ নামের কমেডি সিনেমায় ফুটিয়ে তুললেন আলবার্ট আইনস্টাইনকে। তা দেখেই রিচার্ড অ্যাটেনবোরোর মন গলে গেল। এই ছেলেকেই তো এত দিন খুঁজছিলেন। এক বিশেষ চরিত্রের জন্য, কিন্তু সময় মিলছিল না কারও। চরিত্রে কাজ করার কথা ছিল জনি ডেপ, জিম ক্যারির মতো তারকার। কিন্তু ভাগ্যদেবী চরিত্রটি যে রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের জন্যই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। চরিত্রের জন্য যখন প্রথম স্ক্রিপ্ট পেলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে সাইন করে ফেললেন। ফেলবেন না কেন? কারণ সিনেমাটি ছিল চার্লি চ্যাপলিনের জীবনের ওপর তৈরি করা ‘চ্যাপলিন’। এরপর যখন স্ক্রিপ্ট পড়লেন, তখন আবার আকাশ থেকে পড়লেন। মনে হচ্ছে, আমাকে এক বিলিয়ন ডলারের লটারি দিয়ে জেল খাটানো হচ্ছে। কারণ সিনেমার চার্লি চ্যাপলিনের মতো হাঁটাচলা এমনকি স্ট্যান্ট—সব নিজেকে করতে হয়েছে।
অবশেষে ‘চ্যাপলিন’ মুক্তি পায়। তাঁর দুর্দান্ত অভিনয়ে মুগ্ধ দর্শক থেকে সমালোচক—সবাই। তবে ‘বাফটা’ ও লন্ডন ক্রিটিকসদের কাছ থেকে সেরা অভিনেতার পুরস্কার বাগিয়ে নেন। অস্কারে মনোনয়ন পেলেও জেতা হয়নি। নিজের তীক্ষ্ণ সেন্স অব হিউমার দিয়ে বলেছিলেন, ‘ব্যাপার না। একদিন না একদিন পাবই। বুড়ো হলেও একটি অস্কার দেওয়া হয় আজীবনের সম্মাননাস্বরূপ। বুড়ো তো হবই, সুতরাং অস্কার আমার হবে।’

অস্কারের মঞ্চে পরিচয় দেবোরাহ ফ্যালকোনারের সঙ্গে। তাঁকে বিয়ে করেন ডাউনি। তাঁদের এক সন্তানও হয়, নাম ইন্দিও ফ্যালকোনার। ঝামেলা তাঁর কাছে ছিল নিকট আত্মীয়ের মতো। ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল—এই কয়েক বছরে সম্ভবত জেল-আদালত-বাসা বাদে অন্য কোনো দিকে নজর দেওয়ার সময় পাননি। একবার জেলে যান, এরপর মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পাওয়া। এর কয়েক দিন পর আদালতে হাজিরা দেওয়া। আবার জেলে যাওয়া নতুন কোনো অভিযোগে। ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’ সিনেমার ইনফিনিটি টাইম লুপের মতো। চলতেই আছে, কোনো থামাথামি নেই। মায়ের স্নেহের অভাব বোধহয় খুব বাজেভাবে অনুভব করছিলেন। এই সময়ে মেয়েকে নিয়ে চলে যান স্ত্রী ফ্যালকোনারও।

বারবার প্রতিজ্ঞা করেও যেন বৃত্ত থেকে বের হতে পারছিলেন না। হলিউডপাড়াতেও তত দিনে খারাপভাবে তাঁর নাম ছড়িয়ে গেছে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। না ছাড়তে পারছেন মাদক, না পারছেন মনোযোগ দিতে অভিনয়ে। কেউ সুযোগও দিচ্ছেন না। মাদকাসক্তি কাটাতে শুরু করলেন বিশেষ ধরনের মার্শাল আর্ট। বিপদ এগিয়ে এলেন অভিনেতা ও বন্ধু মেল গিবসন। সুযোগ দেন ‘দ্য সিঙ্গিং ডিটেকটিভ’ সিনেমায়। এই প্রতিদানে এখন বলেন, মেল গিবসন তাঁর কাছে একজন অভিনেতা, একজন বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু। মাদক থেকে বাঁচাতে যেন ত্রাতা হয়ে এলেন একজন। নাম তাঁর সুজান ডাউনি। সুজান তাঁদের বিয়ের সময় একটি শর্ত দিয়েছিলেন, আর জীবনে কখনো মাদক ধরা যাবে না! সেই শেষ! মাদকের সঙ্গে এত বছরের প্রেম শেষ করে প্রেম করা শুরু করলেন সুজান ডাউনির সঙ্গে। মাত্র ৪২ দিন প্রেম করে বিয়ে, সেই প্রেম চলছে এখনো। হলিউডপাড়ায় সেরা দম্পতির তালিকায় সুজান-রবার্ট নামটা ওপরের দিকেই থাকে।
বিয়ের পর বাকি রইল দুই—এক সুজান, দুই ক্যারিয়ার। ফলে ক্যারিয়ারের গ্রাফও আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। ‘কিস কিস ব্যাং ব্যাং’, ‘গুড নাইট’-এর মতো সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর নাম। তবে সবচেয়ে কাঁপিয়ে দেওয়া অভিনয় করেন ‘জোডিয়াক’ সিনেমায়। গত শতকের সত্তর দশকে ঘটে যাওয়া সিরিয়াল কিলিংয়ের ওপর বানানো সিনেমায় জ্যাক গিলেনহ্যাল, মার্ক রাফেলো, অ্যান্থনি অ্যাডওয়ার্ডসের পাশে থেকেও আলো কেড়ে নেন রবার্ট ডাউনি জুনিয়র। ‘পল অ্যাভেরি’ চরিত্রে ডাউনির অভিনয় চোখ রাঙিয়ে দেয় জন ফ্যাভ্রুয়ের।

মার্ভেলের অবস্থা তখন নড়বড়ে। নিজেদের সেরা সুপারহিরো ক্যারেক্টার ‘হাল্ক’, ‘স্পাইডার-ম্যান’, ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’, ‘এক্স-ম্যান’ বিক্রি করে দিয়েছে অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজির কাছে। তবুও দেউলিয়া হওয়া থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারছিল না। শেষমেশ ধারদেনা করে একটি সিনেমা বানানোর কাজে হাত দেয় ‘মার্ভেল’। সিনেমার কাজ দেওয়া হলো ‘জঙ্গল বুক’–এর মতো সিনেমা বানানো জন ফ্যাভ্রুয়ের হাতে। মার্ভেল বলেছিল ব্র্যাড পিট কিংবা টম ক্রুজের কাছে যেতে। কিন্তু ‘টনি স্টার্ক’ চরিত্রের জন্য একজনকেই পছন্দ ছিল জন ফ্যাভ্রুয়ের। তাই মার্ভেলের সঙ্গে মোটামুটি যুদ্ধ করে সিনেমার পুরো স্ক্রিপ্ট না নিয়েই শুরু করলেন মার্ভেল ইউনিভার্সের।

‘এসি/ডিসি’ ব্যান্ডের ‘ব্যাক ইন ব্ল্যাক’ গান ব্যাকগ্রাউন্ডে, হাতে ওয়াইনের গ্লাস টলমল। সেই শুরু। একজন টনি স্টার্ক কিংবা রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের উত্থান! এ দৃশ্য দিয়ে শুরু টনি স্টার্ক কিংবা রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের উত্থান হয়নি। উত্থান হয়েছিল সিনেমা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইউনিভার্সের। শুরুর শুটিংয়ের দিনও হয়তো কেউ ভাবেনি, ১২ বছর পর এখনো সমানভাবে সেই একই আগ্রহ থাকবে। কিন্তু টনি স্টার্ক চরিত্রে সঙ্গে একেবারে মিশে যান ডাউনি। একদিকে সনির ‘স্পাইডারম্যান’, অন্যদিকে ডিসির ‘ব্যাটম্যান’। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কমিক বুক সুপারহিরো এই দুজন। অন্যদিকে কমিক দুনিয়ার ‘বি-গ্রেড’ একটি চরিত্র ‘আয়রন ম্যান’। জন ফ্যাভ্রুয়ের হাতে অন্য চরিত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু এই মাতাল, বিলিয়নিয়ার, সুপার জিনিয়াস স্টার্ককেই মনে ধরল তাঁর। লাইভ অ্যাকশন সুপারহিরো দুনিয়ায় নতুন করে আবির্ভূত হলেন রবার্ট ডাউনি জুনিয়র। স্পাইডারম্যান কিংবা ব্যাটম্যানের মতো পুরো শহর বাঁচানোর দায়িত্ব তার কাঁধে না। স্টার্ক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক থেকে অপহৃত হওয়া এক বন্দী। গুহার ভেতরে বানিয়ে ফেলা এক আয়রন ম্যান স্যুট! এরপর নিজেকে আর বিশ্বকে রক্ষা করা। ছোট্ট করে এই ছিল টনি স্টার্কের সূচনা।
কিছুদিন আগে এই সিনেমার ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করা জেফ ব্রিজেস বলেছেন, ‘আমাদের কাছে পুরো স্ক্রিপ্ট কখনোই ছিল না। আমরা হাফ স্ক্রিপ্টে কাজ করতাম। আমরা অভিনয়ের মাঝেমধ্যেই নিজ থেকে ডায়লগ বলতাম, যেগুলো মুভিতে জায়গা পেয়েছে। এমনকি আমি, রব, জন মিলে মুভির কোন সিন শুট করা যায়, তা–ও ভেবে বের করতাম।’

গিনেথ প্যালট্রো আর জেফ ব্রিজেসকে নিয়ে শুরু করা মার্ভেল ইউনিভার্সে সিনেমা, লোক আর পয়সার অভাব নেই। শুধু আয়রন ম্যান থেকে টিম-আপ করেছেন বিশ্বের সব সুপারহিরোর সঙ্গে। ক্যাপ্টেন আমেরিকা, হাল্ক, থর, ব্ল্যাক উইডো, হক আই আর আয়রন ম্যান। সব মিলে ‘অ্যাভেঞ্জার্স’। এই চবির তিন পর্ব শেষে আসছে চতুর্থ পর্ব। টিম-আপ হয়ে গেছে গার্ডিয়ান্স, ডক্টর স্ট্রেঞ্জের সঙ্গে। নিজের ছত্রচ্ছায়ায় এনেছেন স্পাইডারম্যানকে। ২২ সিনেমা শেষে এখন এই কাহিনি এসে পৌঁছেছে ‘এন্ডগেম’–এ। মার্ভেলের বিশাল ‘ইনফিনিটি সাগা’র শেষ হবে এই ‘এন্ডগেম’ দিয়ে।
আয়রন ম্যান তো মাত্র শুরু! সঙ্গে সঙ্গেই স্ক্রিপ্টের পর স্ক্রিপ্ট জমা হতে লাগল। সুজানের কাজ পড়ল ডাউনির জন্য ভালো সিনেমা বের করা। এর মধ্যেই অভিনয় করলেন ‘ট্রপিক থান্ডার’ সিনেমায়। ২০১১ সালে সুযোগ পেলেন বইয়ের পাতা থেকে তুলে আনা আরেক চরিত্রে অভিনয়ের। স্যার আর্থার কোনান ডয়েল রচিত ‘শার্লক হোমস’! আলবার্ট আইনস্টাইন, চার্লি চ্যাপলিন, টনি স্টার্কের পর শার্লক হোমস—একটুও ঘাবড়ালেন না তিনি। বিলিয়নিয়ার প্লে বয় টনি থেকে ডিটেকটিভ শার্লক হতে এক মিনিটও যেন সময় লাগেনি তাঁর। পুরো চরিত্র যেন তাঁর জন্যই তৈরি। শার্লকের দুই পর্ব শেষ করে তৃতীয় পর্বের শুটিং করছেন এখন। এর আগে শার্লকের ক্যারেক্টরকে সিনেমা পর্দায় এত সুন্দরভাবে ফোটাতে পারেনি কেউই।

জাজ হ্যাঙ্ক প্যালমারের চরিত্রে ‘দ্য জাজ’ আর বন্ধু জন ফ্যাভ্রুয়ের ‘দ্য শেফ’ সিনেমায় অনবদ্য অভিনয় যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। এ বাদে আর কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি তাঁকে। মার্ভেল ইউনিভার্সের টনি স্টার্ক চরিত্রের কারণেই অন্যান্য সিনেমা থেকে তাঁর দূরে থাকা।
Movie reviwe, tony stark, iron man, rdj, robart dawniy j, avenger, end game

ব্যক্তিগত জীবনে একেবারেই অদ্ভুত রকমের একজন মানুষ তিনি। যেমন বিনয়ী, তেমনই সময় পেলে সহ-অভিনেতাদের পচাতেও পিছপা হন না। হলিউডপাড়ায় সেন্স অব হিউমারের দিক দিয়ে শীর্ষস্থানীয় ডাউনি। একসময় যিনি মাদকের পেছনেই সব ডলার উড়িয়ে দিতেন, সেই মানুষটা এখন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের একজন। এক আয়রন ম্যান চরিত্রে অভিনয় করেই তাঁর আয় প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। সামনে আসা ‘এন্ডগেম’ থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার পারিশ্রমিক নেবেন ডাউনি। নিজের ফ্যামিলি আর আয়রন ম্যান ছাড়া আর এখন কোনো চিন্তা নেই তাঁর মাথায়।
তাঁর জন্মই হয়েছিল ‘টনি স্টার্ক’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। এখন এটাই মনে করেন নিজে। নিজের নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘ডাউন’ শব্দটা। জীবনের শুরু থেকেই ডাউন হওয়া ডাউনির জীবনে এখন শুধুই ওপরের দিকে ওঠা। নিজের স্ত্রী সন্তান নিয়ে সুখী রবার্ট। জীবনে অনেক ঘাত–প্রতিঘাত যিনি দেখেছেন, মাদক এত বছরে যার চেহারাকে তেমন কিছুই করতে পারেনি।

সেই মানুষটার জন্মদিন ছিল ৪ এপ্রিল। শুভ জন্মদিন রবার্ট ডাউনি জুনিয়র।

'Iron Man' নাকি রবার্ট ডাউনি জুনিয়র কার জনপ্রিয়তা বেশি!

'Iron Man' নাকি রবার্ট ডাউনি জুনিয়র কার জনপ্রিয়তা বেশি!
Iron Man vs RDJ
২০০৮ সালের টনি স্টার্ক/আয়রনম্যানের আগে ও পরে কতশত সুপারহিরো মুভির লাইভ একশান এসেছে। কিন্তু কোনটাই টনি স্টার্কের মত জনপ্রিয়তা পায় নি। এর কারন প্রশ্নের জবাবটা হয়তো হবে "রবার্ট ডাউনি জুনিয়র"। দ্যা এভেঞ্জার মুভির একটা ডায়লগ আছে টনি স্টার্কের। যেখানে ক্যাপ্টেন আমেরিকা অকা স্টিভ রজার্স টনি স্টার্ককে বলে " বিগ ম্যান উইত এ স্যুট অফ এন আর্মার,  টেক দ্যাট অফ হোয়াট ইউ আর?" যার জবাবে টনি স্টার্ক বলে "জিনিয়াস, বিলিয়নিয়ার, প্লেবয়, ফিলেন্থ্রোপিস্ট"। এই এক ডায়লগেই  ইগোয়েস্টিক টনি স্টার্কের চরিত্র ফুটে উঠে। আর এই টনি স্টার্কের চরিত্র রবার্ট ডাউনি জুনিয়র ছাড়া কেউই এভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতো না। কারন ডাউনি জুনিয়রই যে রিয়েল লাইফ টনি স্টার্ক।

রবার্ট ডাউনি সিনিয়র ছিল পলিটিশিয়ান, হলিউডের এক্টর, ডিরেক্টর, প্রডিউসার, রাইটার। ছোট থেকেই তাই ডাউনি জুনিয়রের হলিউডে পদচারণ। মায়ের সাথে বাবার ডিভোর্সের পরেই বাবার সাথে থাকা শুরু করে ডাউনি জুনিয়র। কিছুদিন বাদে হাই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে পুরোপুরি এক্টিং ক্যারিয়ারে মন দিতে চাইলো। কিছুদিন ব্যালে শিখতে কাটিয়েছে ইংল্যান্ডেও যেন এক্টিং ক্যারিয়ারটা আর শক্ত ভাবে গড়ে উঠে। ব্রিটিশ একসেন্টটা আসে সেখান থেকেই।  ১৯৯২ সালে " চ্যাপলিন" মুভির জন্য পেয়েছিল একাডেমি এওয়ার্ড মনোনয়নও। এ যেন মহাতারকার আগমনের জানান দেয়া ছিল। কিন্তু পতন দেখতে খুব বেশিদিন সময়ও লাগে নি। ডাউনি সিনিয়র ছিলেন ড্রাগ এডিক্ট। আর ডাউনি জুনিয়রের মত তার বাবার ভালবাসা দেখানোর একটা মাধ্যম ছিল ছেলেকেও সাথে করে ড্রাগ নেয়া। আর যার ফলে ডাউনি জুনিয়র নিজের প্রথম মারিজুয়ানা নেয় মাত্র ৬ বছর বয়সে৷ যদিও ডাউনি সিনিয়র শেষদিকে নিজের এহেন কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়েছিল। ৯৬ সাল থেকে ডাউনি জুনিয়রকে কোর্টের চার দেয়ালেই ঘুরতে হয়েছে এই ড্রাগ এডিকশানের জন্য। ১৯৯৯ সালে একবার কোর্টে জাজকে বলেছিল " It's like i have a shotgun in my mouth, and I've got my finger on the trigger. And i like the taste of gunmetal.". ১৯৯৬ সালে একবার এরেস্ট হয়েছিল আগ্নেয়াস্ত্র রাখার কারনে। যখন এটা থেকে প্যারেলে মুক্ত হয়েছিল তার কিছুদিন পরেই আবার ট্রেসপাসিং এর কারনে গ্রেফতার হয়েছিল। তিনবছররের জন্য প্রহিবিশনে ছিল৷ তার মাঝেই আবারো এরেস্ট হয় হ্যাভি ড্রাগের কারনে। এরকম করেই পুরো ৯০ এর দশক কেটেছে তার।

২০০১ সালে ড্রাগের সাথে ৬ বছরের ব্যাটেল শেষে ক্যারিয়ারকে আরেকটু গুছিয়ে নিতে চাইলো এবার। রিহ্যাব শেষ করে নিতে নিতে লেগে গেল আর ৬ বছর। ২০০৭ সাল। প্রথম এক্টিং জব ছিল এল্টন জনের মিউজিক ভিডিও "আই ওয়ান্ট লাভ"। যদিও বড় পর্দায় এসেছে আর আগেই। কিস কিস ব্যাং ব্যাং, জোডিয়াক মুভি গুলো করেছিল ২০০৭ এর আগেই। কিন্তু এটা ছিল ২০০৮ সালে যেখানে সে নিজের ক্যারিয়ার ডিফাইনিং রোল পায়।

একবিংশ শতকের শুরুতে যখন সনি পিকচার্স আর টুইন্টি সেঞ্চুরি ফক্স মার্ফেলের ক্যারেক্টারদের দিয়ে বক্স অফিস কাপাচ্ছিল তখন মার্ভেল নিজেদের স্টুডিও শুরু করে নিজেদের হাতে থাকা সুপারহিরোদের নিয়ে কাজ করার জন্য। মার্ভেলের হাতে অনেক কমিক সুপারহিরো থাকার পরেও তারা ডিসাইড করে তাদের প্রথম প্রডাকশন হবে বি লিস্টেড সুপারহিরো আয়রনম্যানের অরিজিন স্টরি। আর ডিরেক্টর হায়ার করা হয় জন ফ্যাভরোকে। রিউমার ছিল টনি স্টার্কের রোলে আসবে টম ক্রুজ। কিন্তু জন ফ্যাভরোর পছন্দ ছিল রবার্ট ডাউনি জুনিয়র। মার্ভেল স্টুডিও থেকে এটা নিয়ে বিরোধিতাও ছিল ডাউনি জুনিয়রের পাস্ট হিস্ট্রির কারনে। কিন্তু ফ্যাভরোর কথা ছিল এটা তার মুভি সো সেই ভাল জানে। ফান ফ্যাক্ট হচ্ছে রবার্ট ডাউনি জুনিয়র স্কুলে একদিনের জন্য সাসপেন্ড হয়েছিল।  সেটার কারনও ছিল স্কুলে ক্লাস আওয়ারে কমিক বুক পড়া। আর সেটাও ছিল আয়রনম্যান ইস্যু নাম্বার ওয়ান।

মার্চ ২০০৭ সাল থেকে আয়রনম্যান মুভির প্রডাকশন শুরু হয়৷ এবং জুন মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। একবছরেরও কম সময়ে ২০০৮ সালের মে মাসে মুক্তি দেয়া হয় আয়রনম্যান। রেজাল্ট ছিল এক্সিলেন্ট। মুভিটা বক্স অফিসে আয় করে ৫৮৫ ডলার। ডাউনি জুনিয়রের এই মুভির জন্য পেমেন্ট ছিল ৫ লাখ ডলার। কিন্তু মুক্তি পরবর্তীতে প্রফিট শেয়ার বেড়ে যা দাঁড়ায় ২ মিলিয়ন ডলারে। মুভিতে টনি স্টার্ককে পরিচয় করাতে সময় লাগে দুই মিনিটেরও কম। শুরুতেই দেখানো হয় এরোগেন্ট, নার্সেসিস্ট, ওম্যানাইজার টনি স্টার্ক। ব্যাসিক্যালি এক্সোজোরেট ভার্শন অফ রবার্ট ডাউনি জুনিয়র। প্রথম শটেই দেখানো হয় টনি স্টার্কের বা হাতে ধরে স্কচের গ্লাস। যা ইন্ডিকেট করে ফ্যামাস আয়রনম্যান কমিক বুক স্টরি "ডিমন ইন এ বোটল" এর।

ডাউনি জুনিয়রকে এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। আয়রনম্যান-২ রিলিজ হয় ২০১০ সালে। মুভি নিয়ে সমালোচকদের সমালোচনা থাকলেও ডাউনি জুনিয়রের জন্য ছিল শুধুই প্রশংসা। ডাউনি জুনিয়রও সেবার থেকে তার সুপারহিরো ক্যারিয়ারকে সিরিয়াসলি নেয়া শুরু করে। শরীরে প্রটিনের পরিমানে বাড়িয়ে করে নেয় ৩২০০। শুরু করে রেগুলার ইয়োগা ও শিখে নেয় মার্শাল আর্ট। এবং সপ্তাহে ৪ দিন ৯০ মিনিট করে জিম সেশনও শুরু করেন। যা বর্তমানেও বিদ্যমান রয়েছে। তাই ৫৩ বছর বয়সেও পিওর সুপারহিরো লুকে থাকে ডাউনি জুনিয়র৷

সেকেন্ড আয়রনম্যান থেকেই তার সাইনিং মানি ড্রামটিক্যালি বেড়ে যায়। পাঁচ লাখ ডলার এক লাফে হয়ে যায় ১০ মিলিয়ন। আজও রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের আপফ্রন্ট মানি মার্ভেল মুভির জন্য টেন মিলিয়ন ডলার৷ কিন্তু প্রফিট শেয়ারে সেটা আকাশ ছুয়ে যায়। আর কন্ট্রাকের বাহিরের মার্ভেল মুভির জন্য তো স্পেশাল ডিল করতে হয়। যেমন ক্যাপ্টেন আমেরিকা সিভিল ওয়ারের জন্য তার আপফ্রন্ট মানি ছিল ৪০ মিলিয়ন ডলার। যা কিনা টাইটেল রোল করা ক্রিস ইভানস থেকেও অনেক বেশি৷ এবং প্রফিট শেয়ার সহ যা দাঁড়ায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার।  স্পাইডারম্যান হোমকামিং মুভির ৮ মিনিটেএ এক্সটেন্ডেড ক্যামিওর জন্য নিয়েছে ১৫ মিলিয়ন ডলার। আর গতবছর শেষ হওয়া ইনফিনিটি ওয়ারের জন্য ধারনা করা হয় প্রফিট শেয়ার সহ নিয়েছে ২০০ মিলিয়ন ডলার৷

এ পর্যন্ত রবার্ট ডাউনি জুনিয়র মার্ভেল স্টুডিওর মুভি করেছে  ১০ বছরে ৯ টা। যা থেকে তার আয় ধরা হয় প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার৷ যেখানে তার মোট সম্পত্তির পরিমান প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার৷ আর  এ মাসে অপেক্ষায় থাকা এন্ড গেম তো রয়েছেই। ধারনা করা হচ্ছে এন্ড গেম দিয়েই আরডিজের মার্ভেল ক্যারিয়ার শেষ হতে যাচ্ছে। তবে ভক্তদের জন্য অবশ্য হতাশার কিছুই নেই। কারন আরডিজে ঠিকই রয়ে যাবে বড় পর্দায়৷ ২০১১ সালে শার্লোক হোমস দিয়ে যে প্রমান করেছে হি ইজ ক্যাপাবল অফ  লিড মোর দ্যান ওয়ান ফ্রেঞ্চাইজি। ২০২০ সালে আরডিজে আসছে "দ্যা ভয়েজ অফ ডক্টর ডুলিটল" নিয়ে। আর আসছে "শার্লোক হোমস-৩" আরডিজে যাচ্ছে না কোথাও শুধু আয়রনম্যানে ফিরে আসছে না।

ভবিষ্যতে হয়তো মার্ভেল আবারো আয়রনম্যানকে পর্দায় ফিরিয়ে আনবে। হয়তো আরডিজেকে রিপ্লেস করে দিবে অন্য কেউ। তার জন্য শুভকামনা থাকবে। আর তার সাহসের জন্য বাহবা দিতে হবে। কারন একটা ইম্পোসিবল রোলই যে সে চুজ করতে যাচ্ছে। কারন আরডিজেই টনি স্টার্ক/ আয়রনম্যান.

Linkin Park & Chester Charles Bennington কিছু স্মৃতিকথা


I tried so hard and got so far
But in the end, it doesn’t even matter
I had to fall to lose it all
But in the end, it doesn’t even matter
আপনার কাছে এটা হতে পারে কয়েকটা শব্দগুচ্ছের ৪ টা লাইন মাত্র, কিন্তু প্রতিটা "লিংকিন পার্ক" ভক্তের কাছে এটা আবেগমিশ্রিত অমৃতসুধা। যে সুধা পান করে প্রতিটা ভক্ত গিয়েছে চেতনার গন্ডির ওপারে, হয়েছে বেনিংটন মাদকে আসক্ত! এই যে চেস্টার বেনিংটন নামের সুরযন্ত্রটা এভাবে মাতিয়া রেখেছে পার্থিব বিষন্নতাকে, সেই ছাপচিত্রের পেছনের কাহিনীটা হয়ত অনেকেরই অজানা। নব্বই দশকের শেষে "লিংকিন পার্ক" নামক ব্যান্ড-খানা না তৈরি হলে হয়ত এভাবেই মহাকালের বিস্মৃতির গভীরতায় হারিয়ে যেত দুনিয়া কাঁপানো এক কিংবদন্তি।


মাদকাসক্তি, যৌন নিপীড়নের শিকার আর স্কুলে সহপাঠীদের বেদম মার খাওয়া - চেস্টার বেনিংটন এর গল্পের শুরুটা হয়েছিল বিভীষিকাময় কিছু জিনিস দিয়ে।১৯৭৬ সালের ২০ মার্চ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাতে পুলিশ অফিসার বাবা ও নার্স মায়ের ঘরে চেস্টার বেনিংটনের জন্ম। কিন্তু বিধি যেখানে বাম, সেখানে অল্পতেই অসফলতার ছোঁয়া। ৭ বছর বয়সেই,
বয়সে বড় এক বন্ধুর দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হন তিনি। লজ্জায় কারো কাছে এই ঘটনা বলতে পারেননি, কয়েক বছর ধরে সবার অগোচরে সমানতালে চলতে থাকে এই নিপীড়ন। কথাটা একসময় চেস্টারের বাবার কানে গেলেও চেস্টার তখন কোনো আইনী ব্যবস্থা নিতে চাননি। কারণ তখন তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছিল, যে ছেলেটি তার সাথে অন্যায় আচরণ করেছিল, সে নিজেও এমনই এক অপরাধের শিকার হয়েছিল আগে। মূলত চেস্টারের জন্য বরাদ্দ দূর্ভাগ্যের তালিকা সেখান থেকেই শুরু। ১১ বছর বয়সে বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে তাঁর। নিপীড়নের যন্ত্রণা আর একাকীত্ব, দুটোই যেন ঘাড়ে  একেবারে জেঁকে বসেছিল একেবারে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো। ফলশ্রুতিতে, মাদকের সংস্পর্শে আসেন চেস্টার। অভিভাবক আর বন্ধুহীন জীবনে আফিম, মেথ, কোকেন আর অ্যালকোহল হয়ে ওঠে তার নিত্যদিনের সঙ্গী। বিরানব্বইয়ের দিকে মাদক থেকে কিছুটা দূরে থাকার চেষ্টা করলেও কাঠালের কাঠার মতো তা আবারো আত্মার সাথে জুড়ে গেলো। ২০১১ সালে,ওয়ার্ল্ড ট্যুর এর সময় মদ্যপান করেন প্রচুর আর বলেছিলেন – “I just don’t want to be that person anymore.”১৯৯৬ সালে যখম সামান্থা অলিট নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন তখনো জন্ম হয়নি লিংকিন পার্কের। এক পুত্রসন্তান-সহ এই জুটির ডিভোর্স হয় ২০০৫ সালে। পরের বছরই চেস্টার বিয়ে করেন তালিন্দা অ্যান বেন্টলিকে, এই স্ত্রীর সাথে সংসার করেছিলেন মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত।


ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে একসময় অ্যারিজোনা থেকে লস এঞ্জেলেসে পাড়ি দেন চেস্টার। এখানেই তিনি একটি ব্যান্ডের জন্য অডিশন দেন, পরবর্তীতে যেই ব্যান্ডের নাম হয় ‘লিংকিন পার্ক’। ব্যান্ডকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তুলতে কফিনের শেষ পেরেকটা ঠুকে দেন এই সুরের বাজিকর।ব্যান্ডের লাইন আপ পূর্ণতা পায় চেস্টারের উপস্থিতিতে। এই যে আজকে লিংকিন পার্কের "ঈর্ষণীয় সাফল্য" সেটা এনে দিয়েছেন এই চেস্টার নিজেই। কথায় আছে, "বিধাতা যারে দেয়, সবমতেই দেয়"। ফলে প্রথম এ্যালবাম ‘হাইব্রিড থিওরি’ দিয়েই বাজিমাত। উপরে যে চারটা লাইন লিখেছি এই লাইনগুলো সহ ‘ক্রলিং’, ‘ওয়ান স্টেপ ক্লোজার’, ‘ইন দি এন্ড’ আর ‘পেপারকাট’ এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গানগুলো এই এ্যালবামের ফসল। দুই বছর গ্যাপ দিয়ে তারা বাজারে আনে তাদের ২য় অ্যালবাম‘মেটেওরা’। দুর্দান্ত ক্রেজে শীর্ষস্থান ধরে রাখে নতুন এই অ্যালবাম। সাথে, লিংকিন পার্ক যে একটা-দুটো হিট গানের ব্যান্ড নয়, সেটাও বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ হয়ে যায়।আসলে তখন চাহিদা অনুযায়ী, নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার জন্য ‘মেটেওরা’র মতো একটা অ্যালবাম দরকার ছিল খুব। শ্রোতারা সেই অ্যালবাম ভালোভাবেই লুফে নেয়, সাথে লিংকিন পার্ক বিশ্ব সঙ্গীতে তাদের অবস্থানটা পোক্ত করে নেয়। এভাবেই চেস্টারের কাঁধে ভর করে পুরো " লিংকিন পার্ক" উঠে আয় সফলতার চূড়ায়। ২০০৫ সালে চেস্টার লিংকিন পার্কের পাশাপাশি নিজের একটি আলাদা ব্যান্ডে কাজ শুরু করেন। ‘ডেড বাই সানরাইজ’ নামের সেই ব্যান্ডের একটি মাত্র এ্যালবাম মুক্তি পেয়েছে। ‘লিংকিন পার্ক’ যখন সাফল্যের শিখরে, তখন আবার মাদকের কাছে ফিরে যান চেস্টার।

লিংকিন পার্ক ও বাংলাদেশঃ-
যদি ইতিহাস ঘেটে দেখেন তা দেখতে পাবেন, ৯০ দশকে অধিকাংশ কিশোরের ইংলিশ গানের হাতেখড়ি হয়েছে এই লিনকিং পার্ক দিয়ে। যারা ওইসময় ছিলেন, যদি ওরকম কেউ আমার পোস্ট পড়ে থাকেন তাহলে আপনারাই তা ভালো বলতে পারবেন। বাংলাদেশে লিংকিন পার্ক তথা চেস্টারের রয়েছে হাজার হাজার ভক্তকুল। তবে এখানে বেশ মজা একটা কাহিনী রয়েছে।২০১৫ সালে স্টেজলাইট কনটেস্ট জিতে লিংকিন পার্কের স্টুডিওতে কর্মশালার সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশী সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার জায়েদ হাসান। ওইসময়চেস্টারের সঙ্গে বেশ হৃদ্যতা তৈরি হয় তার।দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় জায়েদ এভাবে স্মৃতিচারণ করেছেন চেস্টার কে নিয়ে-

“লিংকিন পার্কের স্টুডিওতে মাইক শিনোডা ও রব বোর্ডনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম।
চেস্টার বেনিংটন তখনো পৌঁছাননি। বাড়ি থেকে বেরিয়েই নাকি জুতা কিনতে গেছেন। নতুন জুতা পরে স্টুডিওতে আসবেন। ভাবলাম, হয়তো আসবেনই না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হাজির হয়ে হইচই জুড়ে দিলেন, নতুন জুতার আনন্দ!মাইক পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরও আমি চুপ করে ছিলাম। চেস্টার আমার পেটে একটা খোঁচা দিয়ে বললেন, স্যরি ম্যান, জুতাটা দরকার ছিল।“
এভাবেই চেস্টার গেঁথে রয়েছেন প্রতিটি বাংলাদেশী ফ্যান মনের কোণে!


চেস্টারের আত্মহত্যা ও একটি কালো অধ্যায়ঃ-
‘সাউন্ডগার্ডেন’ এবং ‘অডিওস্লেভ’ ব্যান্ড এর গায়ক ক্রিস কর্নেল ছিলেন চেস্টারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। চেস্টারের ক্যারিয়ারে বিশাল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন সুহৃদ ক্রিস কর্নেল। বারংবার শ্রদ্ধার সাথে ক্রিস এর নাম উচ্চারণ করেছেন চেস্টার। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, ক্রিস কর্নেলের ৫৩ তম জন্মদিনেই নিজের জীবনের ইতি টেনেছেন চেস্টার। সংবাদ সংস্থা সিএনএন তাদের খবরের শিরোনামে লেখে,
“Chester Bennington dies on his good friend Chris Cornell’s birthday”।
ক্রিস আর চেস্টার- দুজনের আত্নহত্যার ধরনের মধ্যেও মিল রয়েছে। দুজনেই হতাশা এবং মাদকাসক্তির ফলশ্রুতিতে আত্নাহুতি দেন। বন্ধু হারানোর যন্ত্রণা যে কতটা তীব্র হতে পারে, চেস্টার সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। নিজের জীবন দিয়ে সেটা বুঝিয়েও গেছেন বিশ্ববাসীকে। এবার পৃথিবীর রকপ্রেমীদের বোঝার পালা। যন্ত্রণায় বাস করতে করতে তাঁরা বুঁদ হয়েছেন ‘হাইব্রিড থিওরি’তে বা প্রিয় শিল্পীর অন্য গানগুলোতে
যেগুলোয় জীবন্ত চেস্টার বেনিংটন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে হতাশা। হতাশা এমন এক অসুখ, যার উপস্থিতি টের পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। লাখো ভক্তের ভালোবাসা, সাফল্য আর টাকা- কোনোটাই তাদের মানসিক শান্তি দিতে পারেনি। চেস্টার এই বিয়োগ কাঁদিয়েছে পুরো বিশ্বকে, স্তব্ধ করেছে নিঃশেষে, শোকের আলখাল্লা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে পুরো মিউজিক জগৎকে।

স্কুলে নিয়মিত সহপাঠীদের হাতে মার খাওয়া কৃশকায় শরীরের ছেলেটি হতাশার কাছে পরাজিত হয়ে চেষ্টা করেছিল গানের কাছে আশ্রয় খোঁজার। অবশতা দূরীকরণের পন্থা হিসেবে নিয়েছিলেন সংগীতের এলোমেলো ধ্রুপদী। তাইতো আমরা শুনতে পেরেছি,
"I've become so numb, I can't feel you there Become so tired, so much more aware By becoming this all I want to do Is be more like me and be less like you"....
স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের সামনে মঞ্চ কাঁপানো রকস্টারের ভেতরে যে এত অভিমান জমা ছিল, তা কয়জন জানতো? পুরষ্কার থেকে ভক্তদের ভালোবাসাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন সবসময়। ঝুলিতে গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড-এর মতো পুরষ্কার থাকতেও অহংকার করেননি বিন্দুমাত্র। পাকা ধানে কৃষক যেমনভাবে হাত বোলান, তেমনি নিজের হাতটাও বুলিয়ে নিতেন কনসার্টে নিজের ভক্তবৃন্দের মাঝে।


মাইক শিনোডার র‍্যাপ পার্ফরমেন্সের সাথে রোগা একজন লোক শার্টের বোতাম খুলে শ্রুতিমধুর কন্ঠে গান In the end গাইছে। হ্যাঁ, সে গায়কটা-ই আমাদের সবার প্রিয় প্রয়াত চেস্টার বেনিংটন। সে-ই আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে হেভি মেটাল, হিপহপ, অলটারনেটিভ রক, ফাংক্‌, গ্রাংগ্‌ ঘরানা মিশ্রিত এক ভিন্ন ঘরানা, "ন্যু-মেটাল"। ওই প্রজন্ম বুঝতে পেরেছিল র‍্যাপ আর অল্টারনেটিভ রকেও অস্থির মেলোডি উপহার দেয়া যায়। চেস্টারই বুঝতে শিখিয়েছেন, অসাড়তার গন্ডিতে আবদ্ধ থাকার অনুভূতি, অনুভব করতে শিখিয়েছেন পঞ্চম মাত্রার এক জগৎকে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের প্রজন্মটা বড়ই হয়েছে চেস্টারকে বুকের মধ্যে আকড়ে ধরে, চেষ্টা করেছে কর্কশ গলায় গান গেয়ে ঘাড়ের রগ ফুলানোর। ডেড বাই সানরাইজ, গ্রে ডেইজ, স্টোন টেম্পল পাইলটস; প্রত্যেকটা ব্যান্ডেই রেখে গেছেন নিজের অসামান্য প্রতিভার ছিটেফোঁটা। ২০০০ সালের শুরু থেকে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা রক মিউজিশিয়ান বলে গণ্য করা হত। হিট প্যারাডার নাম এক ম্যাগাজিন তাঁকে " সর্বকালের সেরা ১০০ মেটাল ভোকালিস্ট" এর তালিকায় ৪৬ নাম্বারে স্থান দিয়েছে।
শিল্প যদি মানসম্মত হয়, সময় তার অস্তিত্বে চিড় ধরাতে পারে না। সংগীত জগতে "অমরত্ব" নামে একটা শব্দ টুকে রাখা আছে। চেস্টার সেটা নিজের দখলে বাগিয়ে নিয়েছেন অসংখ্য ভক্তের মন জয় করে। ভক্তদের জন্য রেখে যাওয়া গান তারা অন্তরে ধারণ করবে চিরকাল।

হয়ত, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যারা চেস্টার নামক কিংবদন্তিকে দেখতে পারেনি তারাও হয়তো তাঁর রেখে যাওয়া অনবদ্য সৃষ্টিগুলো দৃষ্টিগোচর করে আফসোস করবে, গুগলে সার্চ করবে "Chester Bennington" লিখে। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েকে শোনাতে পারব এক কিংবদন্তির বীরগাথা, যার যুগ আমরা তাঁর গাওয়া গান শুনে কাটিয়েছি। একজন চেস্টারের বিয়োগ, মিউজিক ওয়ার্ল্ডে যে ক্ষতিপূরণ ঘটিয়েছে, তা এক বিরাট ক্ষত সৃষ্টি করেছে রকপ্রেমীদের হৃদয়ে। তাঁর ভুক্তভোগী আমি নিজেও। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ একজন চেস্টারের সময়ে পাঠানোর জন্য! প্রিয় গায়ক!
যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।💖